বন্ধু থাকার উপকারিতা
বন্ধুরা আমাদের
রোজকার জীবনে নানা কাজে আসে । যেমন বন্ধুদের গাড়ি অথবা পড়ে থাকা খালি ফ্ল্যাট সময় বিশেষে
আমাদের জন্য খুব উপকারী। অনেকসময় অল্প বয়সে
আমাদের ওয়েল উইসাররা আমাদেরকে মানে আমরা যারা তখন বিত্তশালী হয়ে উঠি নি তাদেরকে, তাদের
দয়ালু অবস্থাপন্ন বন্ধুদের অর্থের সাহায্য নিয়ে নারী জাতির সমীপে ঠাট বজায় রাখতে বলতেন।
এছাড়া বন্ধুদের রেস্তের ওপর ভরসা রেখে রেস্তোরাঁয়, সিনেমায় কিংবা কাছেপিঠে নানান জায়গায়
যাওয়া যায়। সত্যি কথা বলতে কি মাথায় একটু বুদ্ধি থাকলে এখনও ভারতবর্ষের নানান স্থানে
যেমন কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু প্রভৃতি শহরে বন্ধুর ঘাড়ে চেপে ঘোরা যায়। কিন্তু ...
সময় বিশেষে আগের
বলা কথাগুলো একটাও খাটে না । সেটা এই মুহূর্তে আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। হ্যাঁ আমি।এই
যে আমাকে দেখতে পাচ্ছেন? হ্যাঁ আমাকে যে গাড়ি চালাচ্ছে, তাঁর অবস্থা এককথায় চরম! পেছনে বসা তিনটে মাল আর পুরো আউট মেয়েটা আর আমার
পাশে বসা দুই মূর্তিমান, আমার ছেলেবেলাকার ইস্কুলের বন্ধু। এক এক করে পরিচয় করিয়ে দিই
। গাড়ির পেছনে ডানদিকটায় থমথমে মুখ করে বসে থাকা পাব্লিকটা হলো অনামিত্র। এখন কেবল
টিভির ব্যবসা করে । বিয়ে করে নি । সন্ধ্যেবেলা একা একা বসে মাল টানছিলো । গাড়িতে তুলে
নেবার পর থেকে চুপ করে আছে আর মাঝে মাঝে শালা ঘড়ি দেখে খালি ঘাড় নাড়ছে! তার পাশে বসা
বেঁটেখাটো টেনশড বয়স আন্দাজে একটু বেশি বুড়োটে লোকটা হলো 'পুটু' ওরফে অর্ক । বাপের
পয়সা ধ্বংস করে বাইরে থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর এম.বি.এ আর আরো কী সব করে ফিরে
এসে এখন ফ্যামিলি বিজনেস মানে জুয়েলারীর ব্যবসা দেখছে । জাত হারামি, ম্যারিড, শালা
ফুলটুস মাল খেয়ে আউট দেবত্রীকে কেমন বা হাত দিয়ে জড়িয়ে সোজা করে রেখেছে দ্যাখো! হ্যাঁ, ওর পাশে বসে থাকা উনত্রিশের ডবকা মহিলাটি
হলো দেবত্রী । ইস্কুলে আমাদের সকলের এক নম্বর ব্যাথা ছিল । মাঝে নানা চাপে আর দীর্ঘ
বিচ্ছেদের ফলে ভুলেটুলে গেছিলাম । এখন দিল্লিতে থাকে । ফিন্যান্সে আছে।আবার দ্যাখা
হওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই দেবত্রীর আপগ্রেডেড ভার্সন আমাদের সবাইকে বশ করেছে। এদের মধ্যে
আমি কেবল জানি যে আমাদের 'ও' ম্যারেড । পেছনের বাঁদিক সেঁটে বসে আছে সুজন । সরকারি
অফিসে সদ্য চাকরিতে ঢুকেছে, সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে বাজার করতে যাচ্ছিল, গাড়িতে
তুলে নিয়েছি । এবার সামনের তিনজন । আমি মানে বরুন চ্যাটার্জী ওরফে বব চ্যাটার্জী একটা
মাল্টিন্যাশনাল ইনসুরেন্স কোম্পানি তে বেচু মানে সেলস ম্যানেজার । দু মাস হলো ঢুকেছি
। আগে গাড়ি বেচতাম । আমার পাশের ব্যাক্তিটি মুম্বইয়ের কোনও এক কলেজে অ্যাসিস্ট্যান্ট
লেকচারার হয়ে সবে জয়েন করেছে । চয়ন । ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল । সদ্য তার স্টেটসে ফেলে
আসা টার্কিস লিভ টুগেদার পার্টনার খুয়েছে । কলকাতায় মা বাবার কাছে কয়েকদিনের জন্য এসেছে।
আর লাস্টলি জানলার ধারের গাম্বাটটা হলো অমিত । দার্জিলিং না কোন হিল স্টেশনে গত দু
বছর হলো হোটেলে কাজ করছে । মেয়ে দেখতে কলকাতায় এসেছে।
এই দামড়া বয়সে
এসে আমরা কাল প্রায় বারো বছর পর এক গেট-টুগেদারের মাধ্যমে আবার মিলিত হয়েছিলাম । তখন
শালা জানলে...
আগের দিন সন্ধ্যে সাতটা
অমিতদের বাড়ির
ছাদে নাকি ব্যবস্থা করা হয়েছে । কাকু কাকিমার কোনও আপত্তি নেই । পুলক ফোন করে বলেছিল
। গেট-টুগেদারে কোনও ফ্যামিলি মেম্বার বা সেরকম কাউকে আনা চলবে না । প্রথমে শুনে বলেছিলাম,
'শালা আর জায়গা পেলি না । ওখানে তো বহুত মশা । কাকু কাকিমা ওই জন্যই রাজি হয়ে গেছে
।'
পুলক বলেছিল,
'লাস্ট কবে ওদের বাড়ি গেছিলি? বাড়ির পুরো জিওগ্রাফি পাল্টে গেছে। এখন আর দোতলার ওপরকার
ছাদ নয়, তিনতলার ওপর ছাদ ।'
আরো দু চারটে
কথা বলার পর রাজি হয়ে যাই । ডট সাতটায় পৌঁছে গেলাম । আমি যাওয়ার মিনিট পনেরো কুড়ির
মধ্যে দেখলাম প্রায় সবাই পৌঁছে গেছিলো ।'আরে তুই !' 'এখন সেই একরকম আছিস !' অথবা 'শালা
কি মুটিয়েছিস বে' কিংবা 'এখন কি করছিস?' গোছের প্রশ্ন শুনতে শুনতে বা বলতে বলতে পার্টির
মধ্যে লাট খাওয়া ঘুড়ির মতন উড়ে বেড়াচ্ছিলাম। ঠিক তখন পেছন থেকে তার আবির্ভাব । আমার
পিঠে টোকা দিয়ে সে বলে উঠলো, 'হাই সনি বয় !' ঘুরে তাকে দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য ভ্যাবলা
হয়ে গেছিলাম বলতে আমার কোনো আপত্তি নেই। এতে দেবত্রী খুশি হলো । আমার হাত দুটো আলতো
করে ধরে বললো,' রিমেম্বার মি!দেবত্রী রায়। কোথায় আছিস? কি করছিস?' হালকা খুশিতে ভাসতে
ভাসতে বললাম, ' ইনসুরেন্স সেক্টরে আছি, সেলস ম্যানেজার আগে অটোমোবিলে...।' আমাকে কথা
শেষ করতে না দিয়ে তার মধ্যেই সে প্রশ্ন করে বসলো, 'কোন কোম্পানি?' নাম বলতেই সে এক
গাল হেসে বললো, ' আই এম অলসো ইনটু ফিনান্স।' এর পরের দশ মিনিট ঠিক কিভাবে কেমন ভাবে
যে কেটে গেল জানি না । ও কি বলছিল, কেন বলছিল সব কিছু আমার মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল
। আমি শুধু দক্ষ ব্যালে ডান্সারের মতন ওকে নিয়ে সবাইকে এড়িয়ে ছাদের এ প্রান্ত থেকে
ও প্রান্ত অবধি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম । শুধু ফোন নাম্বার চাওয়ায় মাঝখানে আমি ওকে নাম্বারটা
বলতে ও থামলো আর সেই সুযোগে আমাদের পেছনে এটুলির মতন লেগে থাকা জন্ম কেরানী সুজনটা
আমাদের ধরে ফেলে বলে ফেললো, ' কি রে ! কি খবর তোর?' অগত্যা ঘাড় ঘুরিয়ে হেসে বললাম,'ভালো। কেমন আছিস?'
সুজন কোন উত্তর
না দিয়ে গম্ভীর ভাবে এবার প্রশ্ন করল, ' তোর সেকেন্ড ওয়াইফ এখন কেমন আছে?' দেবত্রীর
নাম্বার সেভ করা হয়ে গেছে; আমাকে মিস কল দেয়া হয়ে গেছে; সে আমাদের কথা শুনছে । ঘাবড়ে
গেলে চলবে না । আমি বললাম, 'এখন ভালো আছে । তোর ছেলেটা কেমন আছে? এখনও আমাশা হয়?'
সুজন চুপ । ভাবছে
ও শালা ভাবছে! কাঠি করতে এসে চাঁদু! দেবত্রী ফিক করে হেসে বললো, 'গাইস, এক্সকিউজ মি
ফর এ মোমেন্ট! উইল জয়েন ইউ ইন এ মিনিট।'
বিন্দুর দিকে
হাত নাড়তে নাড়তে সে চলে গেল । কানে এলো, 'আমার ছেলে কবে হলো?'
বললাম, 'কি জানি
।'
সুজন আরো কিছু
বলতে যাচ্ছিলো । দেবত্রী আর বিন্দুকে লক্ষ্ করছি দেখে বললো, 'সবার ফোন নাম্বার নিচ্ছে।'
ওদিক থেকে চোখ
না সরিয়ে বললাম, ' বেশি মাল খাস না! কাল শালা অফিসে গিয়ে টাল খাবি । বস উদোম ক্যালাবে।'
সুজন, 'যাওয়ার
আগে তোর কাছ থেকে টিপস নিয়ে যাবো । প্রাইভেট ফার্ম এ কাজ করিস! অভ্যেস আছে। বন্ধুকে
বাঁচাস ।' তারপর টুক করে জুড়ে দিলো,' আমি আজকাল কি করছি, কোথায় থাকি জিজ্ঞেস করছিল।
কেন বলতো? '
দেবত্রী বিন্দুকে
পেছনে রেখে এগিয়ে চলেছে । আমি বললাম, ' তোর ছেলের জামার সাইজটা কত?'
সুজন, 'আঁ ।'
আমি এগিয়ে গেলাম । পেছন থেকে সুজন আরো কি সব যেন বললো ঠিক শুনতে পেলাম না । ছাদের দরজার
কাছে দেবত্রীর সঙ্গে আবার দ্যাখা হলো ।
বললো, ' আই আমি
লিভিং। বাড়ি থেকে হাব্বি কল করেছিল । বাই!’
হাঁ করে চেয়ে
আছি দেখে হেসে বললো, ' তোর দুটো বৌ থাকতে আছে আর আমার একটা হাসব্যান্ড থাকতে নেই! কাল
সেকেন্ড হাফ এ কি করছিস? '
বললাম, ' ফার্স্ট
হাফে একটা ট্রেনিং আছে । দিল্লী থেকে কে একজন আসছে । সেকেন্ড হাফ এ তেমন কিছু...।
দেবত্রী বললো,
'ওকে! আমি কল করবো ফাঁকা থাকিস।' সিঁড়ি দিয়ে সে নেমে গেল ।
সেদিন দুজনায়
পরের দিন অফিস
শুরু হওয়ার ঘন্টা তিনেকের মধ্যে ট্রেনিং শেষ । শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ছবি হয়ে
গিয়েছিলাম । দেবত্রী কালকে একবার বলতে পারতো । রিজিওনাল হেড তাকে ইন্ট্রোডিউস করলো।
সে পাক্কা পেশাদারের মতন মুখে এক চিলতে হাসি ধরে রেখে দু ঘন্টা ধরে প্রেসেন্টেশন দিলো
। তারপর রিজিওনাল হেডের সঙ্গে সৌজন্য রেখে কথা বলতে বলতে আমার চোখের সামনে দিয়ে রিজিওনাল
হেড ডি করের রুমে সেদিয়ে গেল । আমি আমার পিন বোর্ডে লেগে থাকা আমার এই মাসের টীম টার্গেট
সংখ্যাটার দিকে চেয়ে রইলাম । এভাবে কতক্ষন? উঠে পড়লাম, বিল্ডিং এর নিচে এসে সিগারেট
ধরালাম আর ঠিক তখন হোয়াটস্যাপ মেসেজটা এল,'ইউ দেয়ার!ওয়েইট ফর মি ডাউনস্ট্যায়ার্স প্লিজ
! কামিং ইন ৫ মিনিটস ।' লিখলাম, 'ওকে ।'
আমার গাড়িতে উঠে
দেবত্রী হাসতে হাসতে বললো, 'তোদের বসটা কি চিপ্কু রে! সারাদিনের জন্য আমাকে বুক করতে
চায় । একটা সিগ্রেট দে তো! ' সিগ্রেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সে আমার দিকে তাকিয়ে
বললো,' সো হোয়ার আর উই গোয়িং?'
বললাম, 'ট্যাংরা
। এই সময়টা বারগুলো ফাঁকা থাকে ।' চোখ বুজে সে বললো, ' ওকে। গুড!'
আধঘন্টার মধ্যে
পৌঁছে গেলাম । গেলাস ভরা, তাই চিয়ার্স বলে দুজনের ঠোকাঠুকি করা, নরম চোখে দুয়েকবার
একে অপরের দিকে তাকানো, এদিকসেদিকের কথা বলা, এইসব বেশ চলছিল । হঠাৎ তাল কেটে দিয়ে
দেবত্রী বলে বসলো,'তোর সঙ্গে ভর দুপুরে বারে বসে মদ খাব না । এভাবে চললে একটু বাদেই
বোর হয়ে যাবো । আর কি করা যায় বল?' আমি ভাবতে লাগলাম । চুপ করে আছি দেখে সে তাড়া লাগালো,
' ফাস্ট ফাস্ট! থিঙ্ক ফাস্ট!' বললাম, ' লেট্'স গো ফর আ লং ড্রাইভ! যাবি?'
দেবত্রী, 'নো।'
আমি,'তাহলে?'
দেবত্রী, 'শালা
দুটো মেয়েকে পটিয়ে লেজিটিমেটালি বিয়ে করেছিস, ইয়ে করেছিস আর আমাকে মাল্টিপল অপসন দিতে
পারছিস না! থিঙ্ক থিঙ্ক ।'
আমি,' আমার বাড়ি
চ ।'
দেবত্রী চুপ করে
আমাকে কয়েক মুহূর্ত দেখলো; মুখে বললো, ' বাড়িতে কে আছে?'
আমি আমার উথলে
ওঠা আবেগ সামলে বললাম, ' এখন কেউ নেই। বউও নেই ।
দেবত্রী ফিক করে
হেসে বললো, 'তাহলে চ।' আমরা রওনা হলাম।
বাড়ি পৌঁছতে আরো
চল্লিশ মিনিট । সারাটা রাস্তায় দেবত্রী কিছু বলে নি । মাঝে মাঝে কেবল হি হি করে নিজের
মনে হেসেছে ।
দোতলার ড্রইং
রুমে ঢুকে এদিকওদিক আশেপাশের ঘরগুলো দেখতে দেখতে দেবত্রী কিছুক্ষনের মধ্যেই বাবার প্রাইভেট
ওয়াইন শেলটা আবিষ্কার করে ফেললো আর আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শিরশিরানি বইয়ে দিয়ে বললো,
'আই লাইক দা এম্বিয়েন্স! ক্যান ইউ পুট সাম মিউজিক ফর মাই শেক প্লিজ! লেটস ড্রিংক এন্ড স্টার্ট আওয়ার সেলেব্রেশন ইন দা
নেম অফ আওয়ার নিউ ফাউন্ড বন্ড এন্ড এভারলাস্টিং ফ্রেন্ডশিপ । ‘ আমি বাধ্য
ছেলের মতন বেছে বেছে শাকিরার 'হিপস ডোন্ট লাই' চালিয়ে দিয়ে সঙ্গীতের তালে তালে ককটেল
বানাতে লেগে পড়লাম । দেবত্রী তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় নেচে নেচে ড্রইং রুমের চারপাশে ঘুরে
বেড়াতে লাগলো ।
সোফার পায়ের কাছে
পা ছড়িয়ে দুজনে পাশাপাশি গেলাস হাতে নিয়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছিলাম । শাকিরার মিউজিকের
তালে তালে আমি গুনগুন করছিলাম 'আরো কাছাকাছি, আরো কাছে এসো।' তার মাঝেই দেবত্রী বিড়বিড়
করে বেশ কয়েকবার বললো,' আই নিড টু গো টু দা
লু ...আই নিড টু গো টু দা লু...' আমি তৃতীয়
বার শুনতে পেলাম । তাকে থামতে বলে উঠে দাঁড়ালাম আর তারপর তাকে ধরে ধরে টয়লেটে পৌঁছে
দিলাম।সে আমাকে 'বাইবাই' 'সি ইউ সুন' ইত্যদি ইত্যদি বলে ভেতরে চলে গেল। আমি আবার এসে
সোফার সামনে পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম।আমার চোখ বুজে আসছিলো শাকিরার গান, গত দুদিনের স্মৃতি,
আমি , অমিতের ছাদ, দেবত্রী , সেলস টাৰ্গেট সব মিলে মিশে যাচ্ছিলো । সব কিছু এক হয়ে
বাথরুম, বাথরুমের ভেতর এই মুহূর্তে বসে থাকা দেবত্রী ... ও একটু বেশি সময় নিচ্ছে
... তা নিক... দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম ... কেউ কি বমি করছে ? বমি? কার বমি? চোখ খুলে বাথরুমের দিকে তাকালাম । হ্যাঁ
আওয়াজটা তো ওদিক থেকেই আসছে! হুড়মুড়িয়ে বাথরুমের দিকে দৌড়লাম।দেবত্রী বেসিনে মুখ গুঁজে
বমি করে চলেছে । কি করবো ভেবে না পেয়ে এক মগ জল নিয়ে পাশে দাঁড়ালাম । একটু বাদে ও থামলে
ওকে ধরে শাওয়ারের তলায় বসিয়ে আস্তে করে শাওয়ার খুলে দিলাম । ও চোখ বুজে বসে রইলো ।
এতক্ষন ঘড়ি দেখি নি । দেখলাম পোনে পাঁচটা বাজে । অদিতি কখন আসবে বলেছিল? ছটা বলেছিলো
না? তার মানে এখনো কিছুটা সময় আছে । আমি বেসিন পরিষ্কার করতে লাগলাম । মিনিট পাঁচেক
বাদে বাইরে এসে মিউজিকটা বন্ধ করে, জিনিসপত্র পরিষ্কার করতে শুরু করলাম । উফ, এবার
বাথরুমে ঘটাং করে কি একটা ভাঙার শব্দ হলো । বাথরুমের দিকে দৌড়লাম । আধভাঙা শাওয়ারটা
এক হাতে ধরে দেবত্রী ঝুলছে আর হাসছে । আমাকে
দেখে বললো, 'ভেঙে গেল ! ' আমি স্বগতোক্তি করলাম,
'আমার গেল !' মিনিট পনেরো নাকানিচোবানি খেয়ে শাওয়ারের পাইপটা দিয়ে জল বেরোনোটা বন্ধ করে, দেবত্রীকে পাঁজাকোলা
করে তুললাম আর সোফার ওপর এনে শোয়ালাম ।বেলটা বেজে উঠলো । 'এখন আবার কে এলো ? ', নিজের
মনে বলে উঠলাম । নিচের দরজার দিকে দৌড়লাম । অদিতি । অদিতি এসেছে । প্রমাদ গুনলাম ।
অদিতি ঢুকে আমাকে দেখে পরপর প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিলো । 'একি! তুমি ভিজলে কি করে?' 'বাড়িতে
কেউ নেই?' ' সিন্টুদাকে কিছু আনতে পাঠিয়েছ
নাকি?' সিঁড়ি দিয়ে তরতরিয়ে সে ওপরে উঠতে লাগলো । আমি পেছন পেছন ওপরে উঠতে লাগলাম ।
পরের প্রশ্নমালা 'এত আলকোহলের গন্ধ কেন?' 'তুমি তো দুপুরে ড্রিংক করো না। তাহলে?' সে
আমার দিকে এগিয়ে এসে জামা শুঁকতে শুরু করলো । তারপর ঘটনাটা ঘটলো ।অদিতির প্রশ্নবাণ
যখন আমি সামলাচ্ছিলাম, ঠিক তখন আমাদের পেছনে দেবত্রী সোফার ওপর নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে
উঠে উদাত্ত কণ্ঠে তার উপস্থিতি ঘোষণা করলো ।শরীরের দুপাশে হাত দুটো ছড়িয়ে দিয়ে সে গেয়ে
উঠলো, 'বেবি কে দেখে ঝুমকে / লাগাদে চার ঠুমকে / ছি ছোড়ে নাচে জমকে / রে এ এ এ এ' এবং
তারপর টাল সামলাতে না পেরে পা পিছলে মেঝেতে ধপাস। তারপর চুপ । অদিতি আমার দিকে তাকিয়ে
চুপ । আমি ওপর দিকে তাকিয়ে চুপ । সব চুপ । কয়েক সেকেন্ড বাদে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অদিতি
বললো, 'বাই বব !' সে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিলো
।
আমি, 'অদিতি লিসেন
টু মি । তুমি যেমনটা ভাবছো তেমন কিছুই হয় নি ।
অদিতি,'আমি কি
ভাবছি?'
আমি, 'তুমি ভাবছো
...তুমি ভাবছো... ।'
অদিতি, 'আমি ভাবছি
তুমি ঘরে একজন মহিলাকে নিয়ে এসেছো।আমি কি ঠিক?'
আমি, 'ইয়েস।'
অদিতি, 'আমি ভাবছি
তুমি ঘরে একজন মহিলার সঙ্গে বসে ড্রিংক করছিলে। আমি কি ঠিক?'
আমি, 'ইয়েস।'
অদিতি, 'আমি ভাবছি
তুমি, তোমরা দুজনে বাথরুমে এক সঙ্গে ... '
আমি, 'ইয়েস।না
মানে নো, তুমি যা ভাবছো তা নয় ।'
অদিতি, ' আই জাস্ট
কান্ট বিলিভ! আই এম ষ্টীল স্ট্যান্ডিং হিয়ার এন্ড লিসেনিং টু ইউর...?
আমি, ' আমি বুঝতে
পারছি তোমার মনের অবস্থা । ওকে তোমাকে আমার কথা শুনতে হবে না । দেখতে পাচ্ছ তো উনি
অসুস্থ । ডু মি এ ফেভার । হেল্প মি টু টেক হার টু দা বেডরুম। লেট্ হার গেট ব্যাক টু
হার সেন্সেস । উই ক্যান দেন ডিসাইড? হোয়াট ডু যু থিঙ্ক?’
অদিতি হাঁ করে
আমার দিকে চেয়ে রইলো । তারপর বললো, 'তুমি মাথার দিকটা ধরো।' আমরা দুজন দেবত্রীকে চ্যাংদোলা
করে বেডরুমে শুয়ে দিলাম । আমি অদিতিকে বললাম,'থ্যাংকস।' অদিতি আস্তে আস্তে বললো, '
সবাই ঠিকই বলতো। তোমাকে বিয়ে করার আগে; বিফোর গেটিং ইনভল্ভদ উইথ এ ডিভোর্সড পার্সন,
আই শুড হ্যাভ বিন মোর কেয়ারফুল । আনিওয়েস আই এম লিভিং নাউ ।' আমি পেছন পেছন নিচে গেলাম । মুখে বললাম, ' আমি আবার
বলছি আমি কিন্তু সেরকম কিছু করি নি ।' ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে একবার কটমটিয়ে দেখে অদিতি বেরিয়ে
গেল । আমি একবার একটু গলা তুলে বললাম, ' আই উইল ওয়েইট ফর ইউ । উই ক্যান হ্যাভ ডিনার
টুগেদার !'
ঘরে ফিরে এলাম।
দেবত্রী এখনো শুয়ে আছে। বাড়ি পৌঁছতে হলে এড্রেস লাগবে।অমিতকে ফোন করলাম ।
দা জার্নি
অমিত বললো, 'সত্যি
বল তো! হলো কি করে? ' আমি এখন ড্রাইভ করছি। গত আধঘন্টায় অমিত আমাকে এই প্রশ্ন অন্তত চার থেকে পাঁচবার করেছে । গালাগাল করে ওকে লাভ নেই
। পেছনে দেবত্রীকে ধরে বসে আছে । দেবত্রীর বাড়ির ঠিকানা ও জানে না । বলেছে চয়নের বাড়ির
ঠিকানা ও জানে । চয়ন হয়তো বলতে পারবে । তাই আমরা চয়নের বাড়ি যাচ্ছি । এখন চারপাশ অন্ধকার
। দু তিনবার ভুলপথে গিয়ে আর থাকতে না পেরে অমিতকে সবে খিস্তি করতে আরম্ভ করবো তখন ও
বললো, ' ওই তো ওই বাড়িটা।' দেবত্রী পেছন পেছন ধুয়ো তুললো, 'হ্যাঁ হ্যাঁ ওই বাড়িটা ।' হর্ন বাজালাম, নাম ধরে ডাকলাম, চয়ন বেরিয়ে এলো।
আমাকে দেখে কি বলতে যাচ্ছিলো । ইশারায় পেছনে দেখালাম । সে ঘাড় নেড়ে বিজ্ঞের মতন বললো,
' ও আচ্ছা ! বুঝেছি । আয় তোরা সব ভেতরে আয়।'
আমি বিরক্ত হয়ে
বললাম, 'ধুর শালা! দেবত্রীর বাড়ি চিনিস?'
চয়ন বললো, ' না
তো । কেন বলতো?' আমি অমিতের দিকে তাকালাম । অমিত একটু আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো,
'কাউকে চিনিস যে জানে?' মাথা চুলকোতে চুলকোতে
চয়ন বললো, 'অনামিত্র জানবে । আই এম সিওর।' বললাম, 'উঠে আয়।' চয়ন হাঁ করে চেয়ে থেকে
বললো, ' বাড়িতে লোক এসেছিল। মেয়ের বাড়ির লোক ।'
আমি আর থাকতে
না পেরে বললাম, 'উফ! তুই,অমিত তোরা সবাই কি শালা মেয়ে দেখতে এসেছিস? কাল তো বলিস নি!
তুই উঠে আয় । কাকু সামলে নেবে । বেশি ভাবিস না । না এলে শালা তোমার হবু শশুরের সঙ্গে
তোমার টার্কিস লিভ ইন পার্টনারের গপ্পো আমি এখুনি আরম্ভ করে দেব ।' ' দেবত্রী পেছন পেছন ধুয়ো তুললো, 'হ্যাঁ হ্যাঁ আমিও
আরম্ভ করে দেব ।' ওষুধে কাজ হলো । চয়ন সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে উঠে এল । চয়নের দেখানো পথে
আমরা অনামিত্রর বাড়ির দিকে রওনা দিলাম । রাস্তায় চয়ন কেবল একবার ইশারায় অমিতকে জিজ্ঞেস
করেছিল কেস কি ? অমিত রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে আমি ওদের লক্ষ্ করছি দেখে বললো, 'বব কে জিজ্ঞেস
কর!' আমি গাড়ি চালাতে চালাতে বললাম, ' সেরকম কিছুই না।আমি কিছুই করি নি । এরকমটা হবে
আগে জানলে...’ আমার কথার পিঠে আধবোজা চোখে আধশোয়া অবস্থায় দেবত্রী স্বগতোক্তির মতন
জুড়ে দিলো, ' এরকমটা হবে আগে জানলে আমি ববকে কক্ষনো accompany করতাম না ।' আমি উত্তেজিত
হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম । চয়ন আমাকে হাত তুলে বললো, 'গাড়ি দাড় করা । আমি
সামনে আসছি ।'
চয়নের
instruction অনুযায়ী আমার একটু বাদে অনামিত্রর বাড়ি পৌঁছলাম । পৌঁছে অমিতকে বললাম,
অনামিত্রকে ডাক।অমিতের কি মনে হলো কে জানে, ও নেমে গিয়ে দুমদুম করে দরজায় ধাক্কা দিতে
থাকলো । ভেতর থেকে অনামিত্রর আদি ও অকৃত্রিম খসখসে গলাটা শোনা গেল । অমিত আবার ধাক্কা
দিতেই দরজা খুলে হুড়মুড়িয়ে অনামিত্র বেরিয়ে এল । বাস অমনি অমিত ওকে জাপটে ধরে গাড়ির
কাছে নিয়ে এসে তুলে ফেললো । ও কিছু বোঝার আগেই গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিলাম । কিছুক্ষন
বাদে চয়নের প্রশ্ন অনামিত্রকে, 'দেবত্রীদের বাড়ি কোন দিকে রে?'
অনামিত্র, ' আমি
কি করে জানবো ।'
দেবত্রী, 'তুমি
জানো তো সোনা! আমি তোমাকে তো বলেছি আমার সব কথা । এদের কাছে কিছু লুকিয়ো না ।' (পেছনের সিট্ এ একটু ডানদিক ঘেঁষে অনামিত্রর
কাঁধে মাথা রাখতে রাখতে জড়িয়ে জড়িয়ে আদুরে গলায় সে বলে উঠলো )
অনামিত্র ঘাবড়ে
গিয়ে, 'আরে একি কিচাইন রে বাবা । আমি জানি না । সেদিন গেটটুগেদারেই তো আবার সবার সঙ্গে
দেখা হলো এতদিন পরে! আমি সেই স্কুল লাইফে যখন সল্টলেকে থাকতাম তখন ওর বাড়ি চিনতাম।তাও
ওদের পাড়ার ছেলেরা ফের দেখতে পেলে ক্যালাবে বলেছিলো ।তারপর আর ওদিকে যাই নি । এদিকের
বাড়িটা চিনি না মাইরি বলছি । বিশ্বাস কর!'
দেবত্রী, 'কাপুরুষ!'
(অনামিত্রর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলে উঠলো)
আমি গাড়ি চালিয়ে
চলেছি । চয়ন একটু ভেবে হঠাৎ ওর ফোন ডায়াল করতে শুরু করলো ।
চয়ন, ' হ্যালো
বিন্দু !'
বিন্দু ফোনের
ওপাশ থেকে, ' হ্যাঁ হ্যাঁ আমি জানি । আমি একটু busy আছি ।তোরা পৌঁছ আমি আসছি ।' (ফোন
কেটে গেল )
চয়ন, 'যা শালা!
ফোন কেটে দিলো!'
পেছন থেকে অমিত,
'ও ওইরকম । আমার মনে হয় অর্ক ক্যান হেল্প আস । ওর বাড়িটা এদিকেই ।'
আমি, 'ও মাল এমনি
বেরোবে না ।জাত হারামি! তাছাড়া বৌ আর বাপ দুজনে কেলিয়ে পাট করে দেবে । টোপ দিতে হবে
। দাঁড়া আমি দেখছি!' (গাড়িটা একটু সাইড করে মোবাইলটা বের করলাম)
তারপর...।
আমি,'হ্যালো পুটু!
হ্যাঁ, আমি । শোন না! তোর মানে তোদের কি একটা লোনের দরকার ছিল বলছিলিস না সেদিন? ওয়েল
এটা তোর লাক বলবি কিংবা অন্য্ কিছু আমি জানি না, একটু আগেই আমাদের কলকাতা ব্রাঞ্চের
হেডের সঙ্গে কথা হচ্ছিল । তার ওয়াইফ আবার সিটিব্যাংকের loan sanction ডিভিশনে কাজ করে
। তোর কথা বলেছিলাম । তোর সঙ্গে দ্যাখা করতে চায় আজ । কাল আউট অফ ক্যালকাটা চলে যাচ্ছে
। আসতে পারবি? না যদি অসুবিধে থাকে তোর থাক । না না গাড়ি লাগবে না । আমি এদিকেই এসেছিলাম
একটা কাজে গাড়ি নিয়ে ... । তুই বেরিয়ে গলির মুখে চলে আয় । হ্যাঁ হ্যাঁ পাঁচ মিনিট তো?
ঠিক আছে । (ফোন কেটে দিয়ে) আসছে । অনামিত্র তুই ওকে তোর আর দেবত্রীর মাঝে বসাবি ।ওকে
!'
অনামিত্র ঘাড়
নাড়লো ।
পাঁচ মিনিট পরে
অর্ক ওরফে পুটু গলি থেকে বেরিয়ে এল ।হাত নেড়ে ইশারা করলাম পেছনে বসার জন্য । অনামিত্র
কথা মতন দ্রুত নেমে এক গাল হেসে অর্ককে জাপটে বললো 'আয়' । তারপর অনেকটা যাকে ফুটবলের
পরিভাষায় বডি দিয়ে স্ক্রিনিং করা বলে সেইভাবে ওর ফড়িংয়ের মতন চেহারা দিয়ে গাড়ির পেছনের
সিটে দেবত্রীর পাশে বসিয়ে দিলো ।আমি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিলাম । অর্ক প্রথমে একটু ভ্যাবাচ্যাকা
খেয়ে গেলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজেকে সামলে নিলো। তারপর ওর আশেপাশের সবাইকে দেখে
মুখ খুললো ।
অর্ক, 'আরে! আমরা
সবাই কি তোর ব্রাঞ্চ হেডের কাছে যাচ্ছি? হে হে হে! (তারপর পাশে পেছনে মাথাটা এলিয়ে
দেবত্রীকে শুয়ে আছে দেখে) কী ব্যাপার? What has happened to her? Is she ill?’
চয়ন,'হ্যাঁ ।
বার বার তোর কথা বলছিলো । একটা mishap হয়েছে । ওর বাড়ি আমরা ঠিক চিনি না তো , তাই ও
তোর কথা বললো ...'
চয়নের কথার মাঝে
অমিত জুড়ে দিলো,''out হওয়ার আগে ।'
চয়ন,'হ্যাঁ
just pass out করার আগে বললো তুই ওর addressটা জানিস ।'
অর্ক,' মানে...!'
আমি, ' এটা ছোট্ট
একটা problem; একটু আমাদের direct করে দে তারপর তুই আর আমি ... '
অর্ক,'যা শালা!
আমি এর মধ্যে নেই! আমার কাজ আছে । গাড়ি প্লিজ থামা আমি নামবো ।'
অনামিত্র, 'কেন
বে নেই? শালা (সবার উদ্দেশ্যে) get together এর দিন আমাকে অটোর লাইন দেখিয়ে দেবত্রীকে
জবরদস্তি লিফ্ট দিলো আর এখন আমি নেই!’
অর্ক, 'আরে...'
কথা কাটাকাটির
মধ্যে আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম ফুটের ধার ঘেঁষে । হঠাৎ চয়ন আমার বাঁ কাঁধে টোকা মেরে ফুটপাথের
বাঁ ধারে আঙুল দিয়ে দেখাল।
রাস্তার ধার দিয়ে
ভর সন্ধ্যেবেলায় বাজারের থলি হাতে এক বৃদ্ধ মানুষের সঙ্গে গল্প করতে করতে এগিয়ে চলেছে
সুজন ।
চয়ন,' এটাকে তোল!কাজে
আসবে।‘
আমি,'ধুর ও কি
করবে । আচ্ছা ঠিক আছে । অমিত সুজন বাইরে । ওটাকে পেছনে তুলে তুই সামনে চলে আয় ।'
অমিত কথা থামিয়ে
একবার দেখে নিয়ে খুট করে দরজা খুলে নেমে গেল । অতএব বয়স্ক মানুষটিকে হতভম্ব করে দিয়ে
এক মিনিটের মধ্যে পেছন থেকে পাঁজাকোলা করে বাজারের ব্যাগ সমেত সুজন পেছনের সিটে চালান
।
অমিত (হাঁফাতে
হাঁফাতে চয়নকে),'সরে বস।'
আমি অর্ককে উদ্দেশ্য
করে,'গাড়ি কোন দিকে ঘোরাবো?'
অনামিত্র, 'বল
না বে ! শালা তাড়াতাড়ি ল্যাঠা চুকে গেলে ফিরতে পারবো । আমার কাজ আছে ।
অর্ক,'আমি পাড়াটা
চিনি । বাড়ি চিনি না ।'
আমি,' ঠিক আছে
। তাই বল, পাড়াটা কোন দিকে ।'
অর্ক,' বাঁদিকে
ঘুরিয়ে সোজা নে । তারপর বলছি ।'
ঠিকানা
অতএব ডান, বাঁ,
সামনে পেছনে করে আরো ঘন্টাখানেক পর আমরা পৌঁছলাম অর্কর নির্দেশ অনুযায়ী দেবত্রীদের
পাড়ায় ।
অর্ক, ' এইখানে
নামিয়ে দিয়েছিলাম । এরপর আমি জানি না ।'
সুজন এতক্ষন একপাশে
সিঁটিয়ে বসেছিল ।এইবার একটু সোজা হয়ে বললো, 'একটা কথা বলবো?'
আমরা ওর দিকে
তাকাতেই ও বললো, ' বব left side er চওড়া গলিটা নে তারপর right side গিয়ে third বাড়িটা।'
অর্ক, 'শালা!'
সুজন, 'আমি ববের
ex-wifer বাড়িটাও চিনি!'
আমি, ' শালা এই
হ্যাপাটা কেটে যাক তারপর তোমাকে আমি উদমা কেলাব!'
চয়ন, 'বব
cool down! গাড়ি left side এ ঘোরা ।'
পুরো দু মিনিট
লাগলো বাড়িটার সামনে পৌঁছতে। এখন রাত নটা । বাড়ির সামনে দুজন লোক দাঁড়িয়ে ।
চয়ন,'অমিত তুই
জিজ্ঞেস কর।'
অমিত,' দাদা,
এই বাড়িতে কি দেবত্রী রায় থাকে ।'
একটা লম্বা চওড়া
লোক এগিয়ে এসে ভারী গলায়,'Yep! কেন বলুন তো!'
সুজন গাড়ির ভেতর
অর্ককে, 'আমি একটা কথা বলবো?'
অমিত গাড়ি থেকে
নেমে, 'Actually she is a bit ill! আমরা তাই...
লোকটা,
'Where is she? আরে এতজনের মধ্যে পেছনে ... । আরে she is suffocating । (গাড়ির অন্যদিকে
গিয়ে দরজা খুলে অনামিত্রকে) Please get down. (তারপর অনামিত্র আর অর্ককে দেখে) ওরে
শালা...(তারপর একটু ঝুঁকে ভেতরে ) sweetheart can you hear me ?'
দেবত্রী (চোখটা
অল্প একটু খুলে জড়িয়ে জড়িয়ে), 'শুভ তুমি এসেছো! Please help and save me!' বলে লোকটার
গায়ে ঢলে পড়লো । লোকটা ওরফে শুভ দেবত্রীকে তুলে বের করতে করতে নাক কুঁচকোল ।
শুভ,'আলকোহল!
মাল খাইয়ে শালা । you all wait! 'তারপর জোরে জোরে, 'Brutus! Brutus!' একটা বিশাল আকারের
আলসেশিয়ান বাড়ির ভেতর থেকে দৌড়তে দৌড়তে আমাদের সামনে এসে থামলো ।
শুভ,' just
see that they don't go anywhere!' দেবত্রীকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে সে ভেতরে চলে গেল।
আমরা সবাই এ ওর
মুখের দিকে চেয়ে রইলাম । প্রথম কথা বললো অর্ক, 'শালা একে বলে লাক! কিছু করলাম না ।
নো এনজয়মেন্ট অফ এনি শর্ট ...। জাস্ট ফেঁসে গেলাম । এখন কুত্তার কামড় খাও আর পগারপার
হো জাও ।'
সুজন,'একটা কথা
বলবো?'
অনামিত্র, 'পুটু
(অর্ক) একটু ভেতরে ঢুকে বোস । কুত্তাটা শালা আমার হাঁটু থেকে শুঁকতে শুঁকতে ওপরে উঠছে
রে!'
সুজন,'একটা কথা
বলবো?'
চয়ন, 'আবাল! যা
বলার বল না ।'
সুজন,'শুভ আমার
যতদূর মনে হচ্ছে হলো গিয়ে শুভরাজ ধর । আমাদের স্কুলের আমাদের anti group এর...। ক্লাস
টুয়েলভে কেলাকেলি করে চয়নের চশমা ভেঙে দিয়েছিলো আর তারপর সাসপেন্ড হয়েছিল । কি রে ঠিক
বলছি?'
অমিত,'সে তো বহুদিন
আগে । আমার কাছেও কেলানি খেয়েছিলো একবার । তখন শালা এইরকম চেহারা ছিল না ।'
অর্ক,'আমি তো
কারোর কিছু করি নি । Then why me? সুজন do you have শুভ'স নাম্বার?
চয়ন, 'এইভাবে
কতক্ষন বসে থাকবো?'
সুজন,' না । আরে
মাছ আছে রে থলিতে! ওটার ওপর চড়িস না ।'
আমি,’Guys
don’t panic! I can sort this out!’
অনামিত্র, ‘আগে
এটার তো কিছু কর! (কুকুরটার দিকে চোখ দিয়ে ইশারা করে) মালটা চায় কী?’
সুজন,' আমার একটা
suggestion আছে ।‘
অমিত, 'কুকুরদের
ব্যাপারে আমি কিছুটা জানি । অনামিত্র, I think he likes you. ওর মাথায় আস্তে আস্তে
হাত বুলিয়ে গাড়ি থেকে step out কর । তারপর …’
সুজন, ‘হ্যাঁ,
আমারও তাই মনে হয় । ওকে নিয়ে তুই সাইড হ । তোর জন্য খারাপ লাগছে । তবু আমাদের এখন
…’
চয়ন,‘ ও সব কিছু
করতে হবে না । তোরা সুজনের দিকে চেপে চেপে বস । কুকুরটাকে ভেতরে ঢুকতে দে । অনা ভয় পাশ না । আমি বলছি মালটা সেরকমভাবে
trained নয় ।’ কুকুরটা সেই মুহূর্তে ধমক দেওয়ার মতন করে ডেকে উঠল আর অর্ক ডুকরে ওঠার
মতন করে বলে উঠল ‘মা!’। চয়ন আশ্বস্ত করবার মতন করে আবার বলল, ভয় পাস না । বব তুই স্টিয়ারিং
ছেড়ে গাড়ি থেকে নাম। অমিত সর । আমিও নামব ।’ আমরা দুজনে নামলাম । কুকুরটা জোরে জোরে
ডাকতে লাগল । বুঝতে পারছিলাম না আমাদের কার্যকলাপে Brutus confused হয়ে গেছে নাকি এবার
আরো আগ্রাসী হয়ে উঠবে। আমরা দুজনে পেছনের দিকের খোলা দরজা থেকে একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়ালাম
। কুকুরটা বেরিয়ে এলো জোরে জোরে ডাকতে ডাকতে আর চয়ন এক পায়ে হাঁটু গেঁড়ে বসল । আমিও
তাই করলাম । মাথা নিচু করে আছি আর কুকুরটা ডেকে চলেছে । কোনভাবেই মালটার চোখে চোখ রাখা
যাবে না । একসময় কুকুরটা চুপ করে গেল । সাবধানে চোখ তুলে দেখি চয়ন কুকুরটার গলার কাছে
লোমে হাত বোলাচ্ছে । কয়েক মিনিট পর আমরা উঠে দাঁড়ালাম আর ইশারায় বাকিদের নেমে আসতে
বললাম ।
চয়ন,‘ এবার কী
?’
আমি, ‘বাড়ির ভেতরে
যাবো।’
সুজন,‘মাছের থলি
হাতে ভালো দেখাবে?’ সবাই তাকাতেই সুজন চুপ । Brutus এর পিছু পিছু আমরা এগোতে লাগলাম
। আমাদের ঠিক পেছনে আসতে আসতে সুজন অনামিত্রকে কী বলছে শুনতে পেলাম ।
সুজন, ‘এটাই তো
আমাদের শেষ আসা নয় কী বলিস? পরেরবার ফিটফাট হয়ে যখন আসব তখন না হয় ফুল টুল…’
এরপরের ঘটনায়
কোনও নাটকীয়তা নেই । আমি এবং আমরা সবাই দেবদত্তার বাড়ির লোকদের বিশেষ করে শুভকে পরিস্থিতি
খুলে বলি । দেরিতে হলেও তারা ব্যাপারটা বুঝতে পারে । After all আমরা কেউই তো কচি খোকা
বা খুকি নই । এতদিন বাদে দেখা হওয়ায় সবাই emotionally overboard চলে গিয়েছিলাম আর কী!
নেক্সট গেট টুগেদারে শুভকেও আমন্ত্রন জানিয়ে এসেছিলাম ।
ফিরবার সময় সবচেয়ে
ভোকাল পুটু ওরফে অর্ক ছিল । মনে আছে পেছনের সিটে বসে বসে বলেছিল, ‘Hats of to all
of us. I really liked the spirit. নেক্সট গেট টুগেদার আমরা ববের বাড়িতে করবো।
What do you say guys?’ সবার সঙ্গে আমিও সায় দিয়েছিলাম ।
নামবার সময় একান্তে
একবার শুধু বলেছিল লোনটা যদি সত্যি করিয়ে দিতে পারি খুব উপকার হয় । বলেছিলাম চেষ্টা
করব। সবাইকে এক এক করে তাদের বাড়িতে ড্রপ করে দিয়েছিলাম । একা বাড়ি ফিরতে ফিরতে ফোনের
দিকে একবার নজর দিলাম । দেখলাম অদিতির দুটো মিস কল । রিটার্ন কল করতে করতে বাড়ির দিকে
ড্রাইভ করতে লাগলাম ।