Thursday, June 23, 2016

আমি

                                                                            গৌতম চক্রবর্তী 

নিরলস শব্দ প্রবাহ তাকে ক্লান্ত করে । মাঝে মাঝে কেবল বহু স্বর ও ধ্বনির ভেতর হতে উঠে আসা আধমরা বেড়াল ছানার কাতরানি সে আলাদা করে চিনতে পারে । চোয়ালের দুপাশের মাংসপেশি শক্ত করে, চোখ বুজে, হাত দিয়ে মাথার পেছনে চেপে ধরে, উপুড় হয়ে সে শুয়ে থাকে । চোখের কোনে আস্তে আস্তে ফোটা ফোটা রক্ত জমতে থাকে আর তারপর গড়িয়ে পড়ে । সদ্য কেনা আনকোরা ব্লেড দিয়ে চোখের সাদা অংশে ছোয়ালেই ... । সারা শরীরে যন্ত্রনাটা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে । দাঁত চেপে সে ভেতর থেকে উঠে আসা আওয়াজকে থামানোর চেষ্টা করে । ফলস্বরূপ কয়েক লহমার জন্য একটা অস্ফুট দুর্বোধ্য ঘড়ঘড়ানি গলা থেকে বেরিয়ে আসে । একবার ..দুবার...। তারপর স্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় । গাঢ় লাল রক্তের ভেতর ডুবে যাওয়া বেড়াল ছানার চোখের মনি দুটো আবার ভেসে ওঠে । চোখ দুটো ভাবলেশহীন ভাবে তার দিকে চেয়ে থাকে । তারপর আবার হারিয়ে যায় । কিছুক্ষন নির্জীব হয়ে সে পড়ে থাকে । তারপর হাঁটু মুড়ে উঠে বসে । জানলার পাশে শেঁওলা ধরা পাঁচিলের ওপরে বসে থাকা কাকটা সরু গলিতে সদ্য ফেলা আবর্জনার দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত ডেকে চলে । কাজের বৌ কাজে না আসায় গজগজ করতে করতে একটা চেনা স্বর এক সময় থেমে যায় । দূরে কোথাও বোমা ফাটে । বোমার শব্দ তার কানে এসে ধাক্কা দিয়ে আবার ফিরে যায় । সচেতন পাখিগুলো একসঙ্গে 'গেল গেল ' রব তুলে ডেকে ওঠে । তারপর আবার নীরব হয়ে যায় । ঘড়ির কাঁটা চলার টিকটিক শব্দ; আরশোলাদের খসখসানি; তার চোখ, নাক, কান, হাত, মুখ লক্ষ করে এগিয়ে আসা মশাদের পিনপিন  শব্দ আবার তার চেতনায় আগের মতন ধরা দেয় । চোখের ভারি পাতা দুটো সে আস্তে আস্তে আবার বন্ধ করে । ঘুম পায়.... তার ঘুম পায় । অথচ নীচের ঘরের এক কোনে নিজেকে গুটোতে গুটোতে গুটোতে শুধু শ্বাস নেওয়া ও ছাড়া আর খুব প্রয়োজনীয় কাজের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা মানুষটা অথবা বাড়ীর সমস্ত কাজ নিজের হাতে করতে থাকা মানুষী অথবা আশেপাশের বাড়িগুলোয় আর তাদের মাঝখান দিয়ে শিরা উপশিরার মতন চলে যাওয়া রাস্তাগুলোর ওপরে নির্লিপ্ত, উত্তেজিত বা দ্বিধাজড়িত পায়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলো ! - তাদের ঘুম পায় না । সে বুঝতে পারে, এরা সবাই এক সময়; এই ঘরের ভেতরে; এই বিছানার ওপর;- তার এই হাটু মুড়ে বসে থাকা খাটো শরীরটার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠবে ।  অস্ফুট স্বরে সে বার কয়েক 'খানকির ছেলে', 'খানকির ছেলেগুলো', 'তোদের মাকে ..' বলে ওঠে ।  কথাগুলো সে নিজে শুনতে পায় আর ..। -সেইসব ছেলেগুলো, মেয়েগুলো, তার চেতনায় ধরা দেওয়া প্রাণীগুলো, তাদের দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ তাদের চোখের সামনে বন্ধ হয়ে যেতে দেখতে পায় । বিষন্ন যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীরগুলো স্লথগতিতে ফৌজিসুলভ শৃঙ্খলায় তিনটে লাইন তৈরি করে আর তাকে কেন্দ্রবিন্দু করে এগোতে থাকে । হালকা হলুদ রঙের দেয়াল বেয়ে মাকড়শা আর কালো পিঁপড়েরা নেমে আসে। ঘরের এক কোণ হতে রক্তাক্ত বেড়ালছানাটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে আসে; পাশের ঘরের অবৈধ  সম্পর্কের মতন অন্ধকারে ডুবে থাকা মানুষটা হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে; সমস্ত কাজ একার হাতে করে চলা মানুষীও বিরক্ত হয়ে যোগ দেয় । পায়ের শব্দ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। আধো আলো, আধো অন্ধকারে ডুবে থাকা ঘরের বিছানার ওপর সে তার হাটু মুড়ে বসে থাকা শরীরটাকে পেছন দিকে হেলিয়ে কিছুক্ষনের জন্য আর্চের মতন করে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে । ঘরের ভেতর ঢুকে তারা তাকে গোল করে ঘিরে দাঁড়ায়  ও ক্রমে তার দিকে এগোতে থাকে। চোখ দুটো কড়িকাঠের দিকে স্থির রেখে সে ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক করে আর জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ে । অতএব একটা ছোট বিস্ফোরণ ঘটে আর তার প্রতিক্রিয়ায় দেয়ালগুলোর তেলচিটে হলুদ রঙ আর নীচের পুরনো সিমেন্ট ঝুরঝুর শব্দ তুলে হাওয়ায় মিলিয়ে যায় । হলুদ রঙের তলায় বহু বছর চাপা পড়ে থাকা লাল ইটের পাঁজরগুলো কালো পিঁপড়েগুলোর চোখে পড়তেই তারা সেদিকে বিশৃঙ্খল ভাবে ধেয়ে যায়। তাদের চিহ্নিত পথে মাকড়শারা এগিয়ে যায় আর ধীরে ধীরে দেয়ালগুলোর শরীরে মিশে যায় ।বেড়ালছানাটা কতকটা অস্থির ভাবে ঘরের ভেতর টাল খেতে খেতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দৌড়তে থাকে আর এদিক ওদিক ঠোক্কর খায় । হামাগুড়ি  মানুষটা  দাঁড়ায় আর  বেড়ালছানাটার পেটে কষিয়ে লাথি মারে । তারপর ঘুরে এসে খাটের পাশে দাঁড়িয়ে তার কানের কাছে মুখ এনে বলে, 'সরে যা । আমি শোব ।' সে উঠে বসে, সরে দাঁড়ায়। তাদের চোখের সামনে খাটটা আকার বদলে ফেলে একটা পুরোনো নড়বড়ে ফোল্ডিং খাট হয়ে যায় । তার দৃষ্টির অগোচরে ফাঁকতালে উবে যায় কাঁচের  জানলা আর ভাঁজ করা দরজা। সেখান দিয়ে  ঝাঁপিয়ে পড়ে হাজার হাজার রোদের কণা । সেই আলোতে ডুবে যাওয়া ঘরের এক পাশ থেকে  পড়ার বই, খাতা আর ধুলো মাখা পুরনো পত্রিকা হাতে নিয়ে সে বাকিদের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়ে । সবাই তার সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । ফোল্ডিং খাটে সদ্য শুয়ে  পড়া মানুষটা ঘুমের ঘোরে নাক ডাকতে থাকে ।
                                                                                                                                    (চলবে)

No comments:

Post a Comment